ফেব্রুয়ারিতে ভোগ্যপণ্য আমদানি বেড়েছে, কমেছে ভারী শিল্প কাঁচামালের

পরিমাণগত ও আর্থিক মূল্য বিবেচনায় গত ফেব্রুয়ারিতে আমদানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে।

পরিমাণগত ও আর্থিক মূল্য বিবেচনায় গত ফেব্রুয়ারিতে আমদানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। এ সময়ে কিছু ভোগ্যপণ্যের আমদানি বাড়লেও উৎপাদনমুখী ভারী শিল্পে কমেছে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়ার অর্থ হলো দেশে শিল্প খাতের উৎপাদনে ধাক্কা লেগেছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআরের) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারিতে দেশে মোট পণ্য আমদানি হয়েছে ১ কোটি ৩০ লাখ টন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ আমদানির পরিমাণ ছিল এক কোটি নয় লাখ টন।

শুধু পরিমাণে নয়, শুল্কায়ন মূল্য বিবেচনায় নিলে এ প্রবৃদ্ধির অংকটা আরো বড়। ফেব্রুয়ারিতে দেশে আমদানি হওয়া সব ধরনের পণ্যের শুল্কায়ন মূল্য ছিল ৫৯ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৪৫ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা মূল্যের পণ্য আমদানি হয়েছিল। এ হিসেবে শুল্কায়ন মূল্যের দিক থেকে আমদানি বেড়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ।

ভোগ্যপণ্যের মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ভোজ্যতেলের আমদানি বেড়েছে। পাম ও সয়াবিন মিলে এ মাসে ভোজ্যতেল আমদানির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৪০ হাজার হাজার টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশে ১ লাখ ৫৪ হাজার টন ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছিল।

এছাড়া চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ২ লাখ ১৬ হাজার টন সয়াবিনবীজ আমদানি হয়েছে। ২০২৪ সালের একই সময় আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ৮২ হাজার টন। এসব সয়াবিনবীজ মাড়াই করে সয়াবিন তেল উৎপাদন করে পাঁচটি শিল্প গ্রুপ।

অন্যদিকে রমজানে চাহিদা কমে যাওয়ায় গমের আমদানি ব্যাপকভাবে কমেছে। ফেব্রুয়ারিতে গম আমদানি হয়েছে চার লাখ টন, যা ২০২৩ সালের একই সময়ের তুলনায় ৩৪ শতাংশ কম। গত বছরের একই সময় দেশে গম আমদানি হয়েছিল ছয় লাখ টন।

ভোগ্যপণ্যের শীর্ষ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রোজার চাহিদা অনুযায়ী এবার যথেষ্ট পরিমাণে ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে। ফেব্রুয়ারির আমদানিতে সে চিত্রই উঠে এসেছে। কিন্তু একই সময় গম আমদানি কমার কারণ হলো রোজায় ভোক্তা পর্যায়ে চাহিদা কমে যায়। মানুষ এ সময় গমের তৈরি খাবার অনেকটাই কমিয়ে দেয়। এছাড়া এর আগে গমের যে আমদানি হয়েছিল, তারও একটা ভালো সরবরাহ এখনো বাজারে রয়ে গেছে।’ তবে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়ার পেছনে নির্মাণকাজের স্থবিরতাকেই দায়ী করেছেন এ ব্যবসায়ী।

আমদানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারিতে শিল্প খাতের কাঁচামালের আমদানি কমেছে। এর মধ্যে নির্মাণ খাতের অন্যতম উপাদান সিমেন্ট তৈরির প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকার আমদানি প্রায় ১১ শতাংশ কমে হয়েছে ১৮ লাখ ৬৯ হাজার টন। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ আমদানির পরিমাণ ছিল ২০ লাখ ৯২ হাজার টন।

এমআই সিমেন্ট ফ্যাক্টরি লিমিটেডের (ক্রাউন সিমেন্ট) ভাইস চেয়ারম্যান মো. আলমগীর কবির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারি প্রকল্পে স্থবিরতা থাকলেও জাইকার মতো আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার কাজ চলমান রয়েছে। রেমিট্যান্সের কারণে প্রাইভেট সেক্টরেও কিছু কাজ হয়েছে।’

‘তবে সিমেন্টের কাঁচামাল আমদানি কম হওয়ার মূল কারণ ঋণের উচ্চ সুদ’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‌এ কারণে আমদানিকারকরা স্টক কমিয়ে রাখছে। আবার অনেক কোম্পানি আছে, যারা চাহিদামতো এলসি খুলতে পারেনি।’

দেশে ভারী শিল্পের কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে ইস্পাত খাতের নাম। ফেব্রুয়ারিতে এ খাতের প্রধান কাঁচামাল পুরনো লোহার টুকরো আমদানি হয়েছে ২ লাখ ৬৫ হাজার টন। আগের বছর একই সময় এ আমদানির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮০ হাজার টন। অর্থাৎ ইস্পাত খাতে আমদানি কমেছে ৬ শতাংশ।

নির্মাণ মৌসুমেও ভোক্তা পর্যায়ে চাহিদার ভাটা দুশ্চিন্তায় ফেলেছে উদ্যোক্তাদের। এর মধ্যে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বড় বিনিয়োগেও গেছেন কেউ কেউ। ফলে তাদের উৎপাদন খরচও বেড়ে গেছে। এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, স্থানীয় ইস্পাতের চাহিদার বড় অংশই ব্যবহার হয় সরকারি নির্মাণ ও মেগা প্রকল্পে। কিন্তু এ ধরনের প্রকল্পের কাজ কমে গিয়ে এ খাতে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতার কাছাকাছিও পণ্য প্রস্তুত করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা।

ফেব্রুয়ারিতে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে নতুন কারখানা চালু করেছে দেশের ইস্পাত শিল্পের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম। ২০২২ সালে নির্মাণকাজ শুরু হওয়া নতুন এ কারখানার আওতায় দুটি ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে একটিতে মেল্টিং সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। অন্যটিতে নতুন করে রি-রোলিং মিল স্থাপন করা হয়েছে। নতুন এ দুই ইউনিট চালুর ফলে বছরে পাঁচ লাখ টন রাবার, এক লাখ টন রড ও আড়াই লাখ টন এক্সপান্ড বিলেট উৎপাদনের সক্ষমতা বেড়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

বিএসআরএম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমীর আলীহোসেন এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইস্পাত খাতে নির্মাণ মৌসুমের যে সুবিধা, সেটা মিলছে না। বর্তমানে রমজান ও সামনে ঈদ, ফলে স্বাভাবিকভাবেই আগামী মাসগুলোয় এ শিল্পের কাঁচামালের আমদানি কম হবে। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে মার্কেটে যে স্পন্দন ছিল, সেটা আবার এখন নেই। সরকারিভাবেও যেহেতু নতুন নতুন প্রজেক্ট রিলিজ হচ্ছে না, উৎপাদনের ক্ষেত্রেও এর প্রভাবে কাঁচামাল আমদানি কমছে।’

আরও